সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আদিত্য ভৌমিক | মা দুর্গা আগমন

মা দুর্গা আগমন

আদিত্য ভৌমিক

লেখক আদিত্য ভৌমিকের "মা দুর্গা আগমন" ছোটগল্পের ব্যানার: মণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতিমা, উৎসবে মেতে ওঠা মানুষ এবং রতনের পরিবারের আবেগঘন দৃশ্য।
লেখক আদিত্য ভৌমিক রচিত ছোটগল্প "মা দুর্গা আগমন"-এর বিশেষ ব্যানার। মানুষের হৃদয়ে ও মানবতায় দেবী দুর্গার আগমন—বাংলা সাহিত্য : অনলাইন ম্যাগাজিন-এর শারদীয় নিবেদন।
শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। কাশফুলের দোলায় প্রকৃতি যেন নতুন করে সেজেছে। ভোরের শিশির-ভেজা ঘাস আর শিউলির মিষ্টি গন্ধে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত আনন্দ। ঢাকের মৃদু শব্দ যেন দূর আকাশ থেকে বলে দিচ্ছে, মা আসছেন।

শহরের পূজামণ্ডপগুলোতে তখন ব্যস্ততা। কেউ প্রতিমা সাজাচ্ছে, কেউ আলোকসজ্জা করছে। কেউ ফুল দিয়ে মণ্ডপ সাজাচ্ছে। শিশুরা নতুন জামাকাপড় হাতে নিয়ে আনন্দে ছুটে বেড়াচ্ছে। সবার চোখে অপেক্ষা, সবার মনে একটাই আকাঙ্ক্ষা, কখন আসবেন মা দুর্গা।

এই আনন্দের ভিড়ের বাইরে শহরের এক কোণে থাকত রতন নামের একটি ছোট ছেলে। তার বাবা অনেক দিন ধরে অসুস্থ। সংসারে অভাব। পূজার নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্য নেই তাদের। অন্য শিশুরা যখন নতুন জামা পরে মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, রতন তখন ভাঙা  জানালার পাশে বসে চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

তার মা মৃদু হেসে বললেন, “মন খারাপ করিস না বাবা। মা দুর্গা সবার ঘরে আনন্দ নিয়ে আসেন।”
রতন মায়ের দিকে তাকায়, “মা কি আমাদের ঘরেও আসবেন?”
মা কিছু বলতে পারল না। শুধু ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরল। চোখের জলটা বোধ হয় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেন।

সেদিন সপ্তমীর সকাল। ঢাকের শব্দে চারদিক মুখরিত। রতন দূর থেকে পূজামণ্ডপের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ মণ্ডপের কয়েকজন তরুণ তাকে দেখতে পেল। কাছে এল। জানতে চাইল তার কথা। রতন মুখে এক টুকরো হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল।
তুমি মায়ের কাছে কী চাও?
কিছু না।
কেন?
রতনের চোখ দুটো ভিজে গেলো। গলাটা ধরে এলো। অনেক চেষ্টা করে শেষমেশ বলে ফেলল--
বাবা অসুস্থ। তার সেরে ওঠাটা দরকার।

তারা রতনের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে এল। কথা দিল বাবার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।

রতন নতুন পোশাক পরে মণ্ডপে এসে দেবী দুর্গার দিকে তাকিয়ে রইল। প্রতিমার চোখের দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, মা যেন সত্যিই তার দিকে তাকিয়ে মৃদু মৃদু হাসছেন।
তার চোখ দিয়ে আনন্দ গড়িয়ে পড়ল। সে মনে মনে বলল, “মা, তুমি কি সত্যিই এসেছ? শুধু মণ্ডপে নও, তুমি মানুষের হৃদয়ে!”

সেদিন পূজামণ্ডপে ধূপের গন্ধ, ঢাকের শব্দ আর উলুধ্বনির সঙ্গে মিশে গেল মানুষের ভালোবাসা। কেউ কারও ধর্ম, পরিচয় কিংবা সামর্থ্য দেখল না। সবাই শুধু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখল।
একজন বৃদ্ধ এসে বললেন, “দেবী দুর্গার আগমন শুধু প্রতিমার আগমন নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস, দুঃখের মাঝে আশার আলো এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার আগমন।”

সন্ধ্যায় যখন মণ্ডপের হাজারো প্রদীপ জ্বলে উঠল, রতন তার মায়ের হাত ধরে মণ্ডপের খানিকটা কাছে আসার চেষ্টা করলো। কিন্তু পারল না। কোলাহল মুক্ত এক কোণে এসে দাড়িয়ে পড়ল দুজন। মায়ের চোখের কোণে জমে থাকা অদৃশ্য জল আর মন্ডপ জুড়ে জ্বলে থাকা প্রদীপের নিচে জমা আবছা অন্ধকার -- দুইয়ের কারণ ও পার্থক্য বোঝার চেষ্টায় সে চোখের পাতা দুটো আসতে আসতে মুড়ে ফেলল।
---------xx---------

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় ছোটগল্পগুলো পড়ুন।

আলী হোসেনের ছোটগল্প। এক এক্কে এক।

এক এক্কে এক : ছোট্ট বেলা নামতা পড়ার সময় এভাবেই শুরু করত মান্তু। তখন জানতো না কি এর মানে, কেনই বা পড়তে হয়। মা বলতেন, নামতা হল অঙ্কের মাথা। কিম্বা মেরুদণ্ডও বলতে পারিস। এটা ঠিকঠাক না শিখলে অঙ্ক মেলে না। যখন প্রাথমিক স্কুল ছেড়ে মাধ্যমিকে পৌছেছে, তখন মায়ের কথার মানে বুঝেছে মান্তু। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে, আজ বুঝেছে এর অন্য মানে। এটা না জানলে, জীবনের মানেটাই পালটে যায়। মিলতে চায় না জীবনের অঙ্কটাও। মান্তু তখন ক্লাস এইটে। হঠাৎই দুঃসংবাদটা এলো। ক্লাসে সেলাই দিদিমনি, ফ্রেঞ্চনটের গীট ধরে আটকানোর চেষ্টা করছেন। বোঝাচ্ছেন, কিভাবে একে কব্জা করতে হয়। মান্তু কিছুতেই এই গিঁটকে কব্জা করতে পারছেনা। মাথার ওপর বোঁবোঁ করে ঘুরছে পাখা, অথচ ঘামের স্রোতে ভাঁটার টান নেই মোটেও। বাইরের বাতাসে উত্তাপের পারদ নিশ্চয়ই লু-লেবেল ছাড়িয়েছে। বাতাসের শুষ্ক বুকে তরঙ্গ তুলে সে ছুটে চলেছে শরীর জুড়াতে আন্য কোথাও, অন্য কোনখানে। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে চাঁদনি থেকে দোকানের মাল নিয়ে ফিরছিল ফারহাদ। হঠাৎই চরকির মত ঘুরে গেল মাথাটা। পিচ-গলা রাস্তায় আছড়ে পড়লো মস্ত শরীর। পথ-চলতি নজর চকিতে ঘুরে এল ফারহাদের দিকে। কে বলে কলকাতার হৃদয়ে উষ্ণতার অভা...

দেবাশিস দেব

ইচ্ছে দেবাশিস দেব       দুপুরবেলা বারান্দায় বসে ঝিমোচ্ছিল হরিদাসী। ঠা ঠা রোদ বাইরে, ঘরের ভেতরটাও তাতিয়ে আছে। বারান্দায়  মাঝেমাঝে একটু হাওয়া দিচ্ছিল, উঠোনের জবাগাছটার পাতা নড়ছিল ইতিউতি। দেয়ালে হেলান দিয়ে হরিদাসী মাথামুণ্ডু সব ভাবছিল। গোপাল কাল সকালে আড়তে গিয়েছে মাল আনতে, বিকেলে ফিরে আসার কথা ছিল। কিন্তু ফেরেনি, হয়ত কোন কাজে আটকে গেছে। মাঝেমাঝে এমন যে হয়না তা নয়, কিন্তু হরিদাসী চিন্তা এড়াতে পারেনা। মায়ের মন, সর্বক্ষণ খারাপ চিন্তাই আগে আসে। কখন ফিরবে কে জানে? বাসের সময় জানা নেই হরিদাসীর। অবশ্য দরকারও পড়েনা বিশেষ। এই গ্রামেই জীবনটা প্রায় কেটে গেল। ষাট বছর হতে চলেছে বয়স। হরিদাসী ভাবে, কবে বউ হয়ে এসেছিল এই বাড়িতে, গোবিন্দর হাত ধরে । সেও অনেকদিন , বছর চল্লিশেক তো কম করে। গোবিন্দ গান  গাইত, কীর্তন , পালা এইসব। ঘোষেদের বাড়িতে বছরে দুবার বাঁধা ছিল। এছাড়াও আশেপাশের গ্রামগঞ্জ থেকে ডাক আসত। মুদির দোকানটা নামমাত্র , ব্যবসায় কোন দিনই সেরকম মন ছিল না গোবিন্দর। সন্ধে হলেই পুরনো হারমনিয়ামটা নিয়ে বসে যেত। রাধার মানভঞ্জন , আরও কতকি? হরিদাসী মুখ্যু মেয...

মুর্শিদ এ এম

ফুরিয়ে না-যাওয়া মানুষটা এরপর আমাদের পরম প্রতিভাবান চাচার কথা বলি। বলতে হয় চাচা, কিন্তু বয়েস আমাদের চেয়ে কিঞ্চিৎ ভারী। আমি একসময় এই চাচাকে সিগারেট অফার করেছিলাম; সে অনেক দিনের কথা, যখন আমরা নিজেদের ভাগ্য ফেরানোর জন্যে ইন্সিওরেন্স কোম্পানির মতো দেখতে এক কোম্পানিতে জয়েন করেছিলাম। চাচা সিগারেট সেদিন নেয়নি, নিত না, আজও কোনো নেশা নেই।